Event, Higher Study in Korea, Technology

দক্ষিণ কোরিয়ায় ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্কলারশিপ নিয়ে উচ্চশিক্ষা

দক্ষিণ কোরিয়ায় ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্কলারশিপ নিয়ে উচ্চশিক্ষা

পর্ব ১

ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উচ্চশিক্ষা

সাউথ কোরিয়ায় “ইঞ্জিনিয়ারিং” এ স্টাডি করতে আসা শুনলেই আমাদের প্রথমে যেটি মাথায় আসে সেটি হলো Samsung, LG এবং Hyundai এর মতো কোম্পানি গুলোর নাম । এর প্রধান কারণ হলো কোম্পানি গুলো আমাদের দেশে অনেক ইঞ্জিনিয়ারিং প্রজেক্ট এর সাথে জড়িত। অনেকে এই কোম্পানি গুলোর যে শাখা আমাদের দেশে আছে সেখানে চাকুরীরত আছেন অথবা চাকুরীর অভিজ্ঞতা আছে। আমি আমার দুই বছর চার মাস অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি সাউথ কোরিয়া ইঞ্জিনিয়ারিং এবং টেকনোলজির দিক থেকে অনেক উন্নত। আর এই উন্নতি শব্দের প্রতিফলন সম্ভব হয়েছে তথ্যপূর্ণ সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে, যেখানে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে আন্ডার গ্র্যাজুয়েট এর পাশাপাশি উচ্চশিক্ষার একটা বিরাট দখল আছে। এই বিষয়টি আমি অভিজ্ঞতা সহকারে কয়েকটি পর্বে ভাগ করে লিখার চেষ্টা করবো।

highers studies in engineering

সাউথ কোরিয়াতে  প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়েই ইঞ্জিনিয়ারিং এর সব সাবজেক্ট ই আছে এবং বিভাগগুলো সাধারণত ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের আন্ডারে থাকে (কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে এর ব্যতিক্রম ঘটে যেমন বিভাগগুলো কোনো অনুষদের আন্ডার এ নাই) যা এখানে Graduate School of Engineering, College of Engineering অথবা শুধু Engineering নামে পরিচিত । প্রতিটি বিভাগ এ ফ্যাকাল্টি মেম্বারদের তাদের রিসার্চ ফিল্ড এর উপর একেকটি ল্যাব অথবা রিসার্চ টীম থাকে এবং ল্যাব এর যদি হোমপেজ থাকে তাহলে সেখান থেকে অনেক প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

যেমন আমি যে ল্যাব এ আছি এই ল্যাব এর নাম হলো SSL (Structural System Laboratory)

তেমনি Seoul National University তে-

  1. Concrete Structures Laboratory
  2. Sustainable Environmental Technology Lab etc.

এই হোমপেজ এর লিংক ফ্যাকাল্টি মেম্বারদের ইন্ট্রোডাক্টরি পেজ এই দেয়া থাকে যা খুব সহজেই গুগল করে খুঁজে বের করা যায়। আমি এখানে শুধু সাউথ কোরিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের রাঙ্কিং ভিত্তিকলিস্ট এর লিংকটা দিয়ে রাখছি।

https://www.4icu.org/kr/

ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্কলারশিপ এর অবস্থা

কোরিয়াতে ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টদের জন্য সাধারণত তিন ধরনের স্কলারশিপ যেমন কোরিয়ান গভঃমেন্ট ফান্ডিং, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল ফান্ডিং এবং প্রফেসর’স ফান্ডিং , যেখানে প্রফেসর’স ফান্ডিং এ স্টুডেন্ট বেশি স্কলারশিপ পেয়ে থাকে। এইটার অন্যতম কারণ হলো কোরিয়াতে ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি গুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার সাথে সম্পৃক্ত থাকতে হয়, যেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর’স ফান্ডিং এর প্রধান উৎস। কোরিয়ান গভঃমেন্ট ফান্ডিং যেমন GKS (pdf file) এ বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ১০ জন (৫ জন Embassy Track Quota এবং ৫ জন University Track Quota) গ্র্যাজুয়েট কোর্স এ স্টুডেন্ট নিয়ে থাকে।

আরেকটি গভঃমেন্ট ফান্ডিং বলতে সাধারণত BK21+(Brain Korea 2021) বুঝায় যেটি ছয় বছর অন্তর অন্তর একটি বিশ্ববিদ্যালয় (সব বিশ্ববিদ্যালয় না) পেয়ে থাকে যা ডিপার্টমেন্ট এর সমস্ত স্টুডেন্ট সংখ্যার এপ্রক্সিম্যাটলি ৩০% পায় । এই ফান্ডিং এ আসতে পারলে ভালো, তবে ফান্ডিং যেটাই হোক না কেন টাকার পরিমাণটা প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে আর সব প্রফেসর এর আন্ডারে সমান ই হয়। আর তাই প্রফেসর এর স্টুডেন্ট নেয়া সম্পূর্ণ নির্ভর করে তার গবেষণাগারে (এখানে রিসার্চ টীম অথবা সাধারণত ল্যাব বলে থাকে) কতগুলো প্রজেক্ট চলছে তার উপর । এই তথ্যটা ল্যাবের কোনো সিনিয়র অথবা পরিচিত থাকলে পাওয়া সম্ভব, তা না হলে আপনাকে প্রফেসরের রেসপন্সের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। সুতরাং র‌্যাঙ্কিং এ উপরে বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে স্কলারশিপ পাওয়া টা গ্রেড পয়েন্ট, পূর্ববর্তী গবেষণার পাশাপাশি প্রফেসরের হাতে ফান্ডিং এর উপর ও নির্ভর করে।

ইঞ্জিনিয়ারিং এর ক্ষেত্রে আমি বলতে পারি ফান্ডিং থাকলে প্রফেসর কে পটানোর মূল হাতিয়ার হলো তার গবেষণার সিমিলার গবেষণা যদি আপনার থাকে সেটি আপনার কভার লেটার এ সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করা। অনেক সময় আবার প্রফেসর এর যদি জরুরি ভিত্তিতে স্টুডেন্টের প্রয়োজন পরে তাহলে আপনার ব্যাকগ্রাউন্ড এর এদিক সেদিক হলেও আপনাকে নিতে পারে। এরকম পরিস্থিতিতে আপনার না আসাই ভালো। তাই প্রফেসরের গবেষণার ফিল্ড এর সাথে আপনার গবেষণার মিল থাকলেই ইমেইল করুন, না হলে ইমেইল না করাই ভালো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায় যে ল্যাব এ যদি আপনার পরিচিত জনের সুপারিশে আসলেন এবং সুবিধা না হওয়ার কারণে চলে গেলেন, সেক্ষেত্রে যিনি আপনাকে ল্যাব এ নেয়ার জন্য সুপারিশ করেছিলেন তার সমস্যা হয়ে যেতে পারে। তাই আপনি কাওকে সুপারিশ করতে বলার আগে খুব ভালোভাবে ভেবে নিবেন আপনি আসলেই ঐ ল্যাব এ আসতে চান কিনা। কারণ কথিত আছে এবং কাছ থেকে দেখা অনেকের অনেক বাস্তবিক অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি, যা শুধু মাঝ পথে চলে যাওয়ার কারণে প্রফেসর তার ল্যাবে আর কোনোদিন বাঙালি স্টুডেন্ট নিবেননা।

ডিগ্রী সম্পর্কে কিছু কথা

আমার জানা মতে সাউথ কোরিয়ান প্রফেসররা স্টুডেন্ট নেয়ার প্রয়োজন হলেই শুধু ইমেইল এর রেসপন্স করেন। আর সেখান থেকে কোয়ালিটি এবং গবেষণার মিল রেখে স্টুডেন্ট নিয়ে থাকেন। আগেই বলেছি প্রফেসর এর ফান্ড থাকলে সে বিশ্ববিদ্যালয়ে রিকোমেন্ড করেন, আর প্রফেসরের রিকোমেন্ডেশন থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এডমিশন পাওয়া সহজ। এখানকার বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মাস্টার্স ডিগ্রি ছাড়া পিএইচডি স্কলারশিপ পাওয়া কঠিন কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী মাস্টার্স ডিগ্রী থাকতে হবে। তবে যে বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স লিডিং পিএইচডি আছে সেখানে প্রফেসর চাইলে সরাসরি আপনি পিএইচডি তে আসতে পারবেন। যেকোনো দেশে এবং যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে অবশ্যই আপনার ভালো স্টাডি ব্যাকগ্রাউন্ড আপনাকে স্কলারশিপ পেতে সহায়তা করবে, তবে সেটা সত্যি হলো ফ্রেশারদের জন্য। যারা গ্রাডুয়েশন করার কয়েক বছর পর মাস্টার্স অথবা পিএইচডি তে আসতে চাচ্ছেন তাদের জন্য প্রফেসর এর ফিল্ড রিলেটেড কয়েকটা পাবলিকেশন থাকলে ভালো।

কোরিয়াতে সাধারণত এম.এস. ডিগ্রীর জন্য ২ বছর লাগে, তাই ফ্রেশাররা যদি কোরিয়া থেকে এম.এস. ডিগ্রী সম্পন্ন করে তাহলে অন্য যেকোনো কাঙ্খিত দেশে পিএইচডি স্কলারশিপ পাওয়া খুব সহজ হয়। কোরিয়াতে ডিগ্রি করতে এসেছেন এমন যে কাওকে প্রশ্ন করলে আপনি একটি উত্তর ই পাবেন আর সেটি হলো কোরিয়ান প্রফেসররা খুব প্রেসার এ রাখেন। আমি মনে করি এটা ভালো একটা দিকে যদি সেটা কাজ আদায় করার জন্য হয়। কারণ আপনি এখানে ডিগ্রী করতে আসলে আপনার বিষয় ভিত্তিক অনেক কিছুই শিখতে পারবেন অনেক অল্প সময়ের মধ্যে, যা আপনার পরবর্তী ক্যারিয়ার এ অনেক বড় ভূমিকা পালন করবে।

যদিও সরাসরি পিএইচডি ডিগ্রী তে আসা কঠিন, তবে কোরিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আপনি এম.এস. এ এসে পরে কম্বাইন্ড এম.এস.-পিএইচডি করতে পারেন। এতে টোটাল ৪-৬ বছর পর্যন্ত সময় লাগে। আর আপনি যদি এম.এস. এবং পিএইচডি আলাদা ভাবে করেন তাহলে টোটাল ৫-৭ (এম.এস.-ঃ ২ বছর,  পিএইচডিঃ ৩-৫ বছর) বছর পর্যন্ত সময় লাগে। তবে এটা প্রফেসর থেকে প্রফেসর আলাদা হয়।

ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে রিসার্চের জন্য সহায়ক

আমি আগেই বলেছি কোরিয়া ইঞ্জিনিয়ারিং এবং টেকনোলজির দিক থেকে অনেক উন্নত, তাই এখানে রিসার্চ হয় টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট বেসড। যা ফর্মুলা জেনারেশন থেকে শুরু করে সিমুলেশন এবং কোডিং করার উপর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নির্ভরশীল। সুতরাং আপনার বিগত রিসার্চ ব্যাকগ্রাউন্ড এ আপনি যত বেশি সফটওয়্যার (যেমন: Abaqus, Ansys, OpenSees, Sap, Etabs etc.), কোডিং ল্যাঙ্গুয়েজে (যেমন: Matlab, C++, Python, Fortran, Java, HTML etc.) যুক্ত থাকবেন অথবা স্কলারশিপ নিয়ে আসার আগে এগুলো শিখে আসবেন তত আপনার ডিগ্রীর জন্য সহায়ক হবে। আপনার কাঙ্খিত ল্যাবরেটরি যদি এক্সপেরিমেন্টাল বেসড হয়েও থাকে তারপরেও এই জানা গুলো আপনার রিসার্চ পেপার লিখা এবং প্রজেক্ট রিপোর্ট তৈরির ক্ষেত্রে অনেক সহযোগিতা করবে। আর এ জন্যই কোরিয়ার উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি রিসার্চ ওয়ার্ক সারা বিশ্বে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য।

প্রথম পর্বতে আজ এ পর্যন্তই লিখলাম, আশা করি কিছুটা হলেও কোরিয়ায়  “ইঞ্জিনিয়ারিং” এ উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে আশা সম্পর্কে তথ্য দিতে পেরেছি, যা আমার অভিজ্ঞতার ও জানাশোনার  মধ্যে পড়ে।

লেখক

তাহমিনা তাসনিম নাহার, পিএইচডি রিসার্চ ফেলো, সিভিল এবং এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং, কুনশান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, গুনসান, দক্ষিণ কোরিয়া।

tasnim30.ce@gmail.com, tasnim@pust.ac.bd

http://pust.ac.bd/academic/departments/dept_teachers/dept_teachers_profile/100119

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *